সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য : | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 84 বার পঠিত
ঢাকার ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে ৪ বছর বয়সী শিশু ওয়াইজ কুরুনী আভানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা এখন সত্য ও মিথ্যার এক জটিল লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। গতকাল অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে একের পর এক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। কখনো বলা হচ্ছে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু, কখনো বলা হচ্ছে ডেঙ্গুর জায়গায় অন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য দেখে নেটিজেন ও সচেতন মহল ইতোমধ্যে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
চিকিৎসক সমাজের বক্তব্য ও ডেঙ্গু চিকিৎসার বাস্তবতা
চিকিৎসক সমাজ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ডেঙ্গু পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসলেও অন্যান্য পরীক্ষা ও ক্লিনিক্যাল ফাইন্ডিংয়ের ভিত্তিতে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ডেঙ্গু জ্বরের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এটি মূলত সাপোর্টিভ কেয়ার নির্ভর। তবে যখন ডেঙ্গু জটিল আকার ধারণ করে এবং এই শিশুর মতো মায়োকার্ডাইটিস বিকশিত হয়, তখন উন্নত বিশ্বমানের চিকিৎসায় ব্যবহৃত দামি ইনজেকশন আইভিআইজি দেওয়া হয়। এই ইনজেকশন একসময় বিদেশ থেকে আনতে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হতো। বর্তমানে ইনসেপ্টা কোম্পানি এটি দেশে বাজারজাত করায় খরচ অনেক কমে এসেছে। শিশু আভানের ক্ষেত্রেও এই বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছিল।
জাল বিল ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মুখোশ উন্মোচন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে যে বিলটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেটি জাল ও বিভ্রান্তিকর। হাসপাতালের মূল বিল রেকর্ড অনুযায়ী শিশু ওয়াইজ কুরুনী আভানের (রোগী আইডি এ২৬০৯২৮০০১১৮২) মোট বিলের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৮৭ টাকা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় এই বিল থেকে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা ছাড় দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৫১ টাকা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ যে বিলটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং হাসপাতালকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।
বিলের বিবরণে দেখা যায়, শিশুটির চিকিৎসায় ইকো, এক্স-রে, বিশেষ প্যাথলজি পরীক্ষা, এবিজি ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইসিস, ইনটিউবেশন, নেবুলাইজেশন, অক্সিজেন সরবরাহ, সিরিঞ্জ পাম্প, ভেন্টিলেটর চার্জ এবং পিআইসিইউ সেবাসহ সর্বোচ্চ মানের জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। এই বিল সুশিক্ষিত যেকোনো ব্যক্তিই বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারবেন যে প্রদত্ত সেবার তুলনায় বিলের পরিমাণ যৌক্তিক ছিল।
হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার উপর এই আক্রমণের দূরগামী ক্ষতি
বিষয়টি শুধু একটি হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশজুড়ে একটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। চট্টগ্রামে এখন হামের রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং পর্যাপ্ত আইসোলেশন ও আইসিইউ সিট নেই। ৮ মাস বয়সী একটি শিশু হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া নিয়ে সারাদিন ঘুরেও আইসিইউ সিট পাচ্ছে না। কমপক্ষে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে যেতে বলে দায়িত্বমুক্ত হয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলো ক্রিটিকাল রোগীর দায়িত্ব নিতে ক্রমেই অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে।
এই অনাগ্রহের পেছনে মূল কারণ হলো অপেশাদার গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের অপপ্রচার, যা না জেনে না বুঝে চিকিৎসক ও হাসপাতালকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। একজন মৃত শিশুর পরিবারের দুঃখ অনুভব করা যায়, কিন্তু সেই দুঃখকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা সমাজের জন্য আত্মঘাতী।
হামের জন্য প্রয়োজন আলাদা আইসিইউ, কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং সাধারণ আইসিইউ রোগীদের সঙ্গে রাখলে অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা চাহিদার সঙ্গে পেরে উঠছে না। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সংক্রামক রোগের জন্য আলাদা আইসিইউ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাস তৈরি করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। বরং এই পথে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। কেউ হাসপাতালে গেলেই সব দায় হাসপাতালের — এই মানসিকতা থেকে বের না হলে একদিন ক্রিটিকাল রোগী হাতে নিতে কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতাল রাজি হবে না। তখন সরকারি হাসপাতালের উপর চাপ এতটাই বেড়ে যাবে যে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
এই ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে উসকানিমূলক বক্তব্য, অপপ্রচার, ভুল ব্যাখ্যা ও অবৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার যে পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে, তার বিরুদ্ধে সরকার ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। মনে রাখতে হবে, আজ যদি এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশে আর কেউ চিকিৎসক হতে চাইবেন না। আর সেদিন সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বেন এই দেশের সাধারণ মানুষ, যাদের জন্যই চিকিৎসকরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি রোধে সরকার, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
Posted ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah